ই-কমার্স ওয়েবসাইটে ভিজিটর আনার জন্য কিছু টিপস

অনলাইন শপিং সাইট গুলোর জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হল ভিজিটর আনা নিশ্চিত করা। আপনি অনেক টাকা ব্যয় করে অনেক প্রোডাক্টের ছবি দিয়ে একটা শপিং ওয়েবসাইট করলেন কিন্তু তারপর দেখলেন যে তেমন ভিজিটর আসছে না। লোক না আসলে বিক্রি করবেন কার কাছে? আবার শুধু লোক আসলেই হবে না, আপনি যেসব পন্য বিক্রি করছেন সেগুলোর খোঁজে বা সে গুলো কিনতে চায় এমন ধরনের লোকের আসা নিশ্চিত করাও দরকার। শুধু তাই নয় আপনি বাংলাদেশের ক্রেতাদের জন্য ওয়েবসাইট চালু করেছেন কিন্তু আপনার ভিজিটরদের ৫০% বা তারও বেশি আসছে বিদেশ থেকে। এসব নিয়েই আমি কয়েক পর্বের লেখা শুরু করলাম এই পোস্ট দিয়ে।

পেশাদার ব্লগার ছিলাম এক সময় এবং আমার ব্লগ গুলো প্রায় দেড় কোটির মত পেইজভিউ পেয়েছিল ৫ বছরে। এজন্য আমাকে একটি টাকাও খরচ করতে হয়নি বিজ্ঞাপনের পেছনে। তবে ব্লগের হিট আর অনলাইন শপিং সাইটের জন্য ভিজিটর আনার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। তাই আমার লেখায় কোন ভুল বা সমস্যা পেলে বা কোন রকমের দ্বিমত পোষণ করলে কমেন্ট সেকশনে বিনীত ভাবে ধরিয়ে দেবার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, ইন্টারনেটে লেখাপড়া (যে গুলোর লিংক প্রতি পর্বের শেষে দেয়া হবে) এবং বাংলাদেশে ই-কমার্স নিয়ে অনেকের সঙ্গে কথা বলার ভিত্তিতে আমি এই পোস্ট গুলো লিখছি। আর এই পোস্টটি আসলে অনেকটা ইন্ট্রোডাকশন বা ভুমিকার মত। এখানে যেসব বিষয় সংক্ষেপে তুলে ধরছি সেগুলোর প্রতিটি নিয়েই পরবর্তীতে বিস্তারিত পোস্ট দেবার আশা করি।

১। Content is King বা কন্টেন্টই রাজাঃ ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশান অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেবার পর থেকে বাংলাদেশের শপিং সাইটগুলোর সিংহ ভাগই আমি ভিজিট করে দেখেছি। সবচেয়ে বড় সমস্যা হল কন্টেন্ট তেমন থাকেনা, বিশেষ করে টেক্সট কন্টেন্ট। বড় জোর সুন্দর ছবি। কিন্তু একটু চিন্তা করে দেখেন আমরা কি গুগলে টেক্সট দিয়ে সার্চ দেই না ইমেজ দিয়ে। প্রোডাক্টের বর্ণনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কিন্তু এটি নিয়েও অনেকে অবহেলা করেন। গুগলে সার্চ করে আসা ভিজিটরের কথা বাদই দেন, ফেইসবুকের বিজ্ঞাপন দেখেও যিনি এসেছেন, বা আপনার আত্মীয় বন্ধু যিনি আপনার কার্ড দেখে বা ইমেইল পেয়ে আপনার ওয়েবসাইটে এসেছেন কিছু কিনতে তিনিও কিন্তু প্রোডাক্ট এর সুন্দর ও তথ্যবহুল বর্ণনা আশা করেন।

২। শপিং সাইটের জন্য ব্লগ কেন দরকারঃ আপনার শপিং সাইটের জন্য অবশ্যই ব্লগ থাকা দরকার। ব্লগে আপনি স্বাধীনভাবে লেখা দিতে পারবেন। ধরা যাক ইফাত শারমিন আপুর মত আপনি জামদানী (https://www.facebook.com/JamdaniVille ) বা কাপড় বিক্রি করছেন অনলাইনে। ব্লগে সহজেই জামদানী নিয়ে ১০ লেখা দিতে পারেন এমন সব বিষয়ের উপরঃ ১। বিয়ের জন্য কি ধরনের জামদানী শাড়ি পড়া উচিৎ, ২। ৫,০০০ টাকা বাজেটে কয়েকটি সুন্দর মনকাড়া জামদানী শাড়ির ছবিসহ বিস্তারিত বিবরণ, ৩। কিশোরীদের, তরুণীদের মধ্য বয়সীদের জামদানী শাড়ির রঙ বা অন্যান্য বিষয়ে কোন টিপস। সার্চ ইঞ্জিন ব্লগের ইনডেক্স ভাল করে এটি মনে হয় সবারই জানা।

৩। ফেইসবুককে কাজে লাগানঃ বাংলাদেশে এখন ফেইসবুকে ব্যবহারকারী এক কোটির বেশি। তাই ফেইসবুকে একটিভ হোন এবং একটিভ থাকুন। অনেক (মনে হয় প্রায় সব) ই-কমার্স সাইট ফেইসবুকে পেইড বিজ্ঞাপন ব্যবহার করে থাকে। তাছাড়া আপনার ফ্রেন্ড লিস্টে যদি ৫,০০০ লোক থাকে তাহলে আপনার মেসেজ অনেকের কাছেই চলে যাবে। পেইড বিজ্ঞাপনের পক্ষে আমি কিন্তু ফেইক বা নকল লাইক কেনার বিপক্ষে। নকল লাইক কেনা মানে টাকা পানিতে ফেলা।

৪। সার্চ ইঞ্জিন নিয়ে কাজ করুনঃ আমার যখন কোন কিছু জানার দরকার হয় তখন আমি গুগুলে সার্চ করি। আমার যখন কোন কিছু কেনার দরকার হয় আমি গুগলে সার্চ করি। ৯৯% সময়েই দ্বিতীয় পেইজে যাই না। প্রথম পেইজ থেকেই দরকারি তথ্য পেয়ে যাই। তাই সার্চ ইঞ্জিন থেকে কিভাবে আরও বেশি ভিজিটর আসতে পারে সে বিষয়ে সিরিয়াসলি চিন্তা করুন। দরকার হলে টাকা খরচ করুন এসইও এর পেছনে।

৫। ভিডিও এবং ইউটিউবঃ আচ্ছা বলুন তো পত্রিকা, রেডিও আর টেলিভিশন এই তিনটির মধ্যে কোনটির দর্শক বেশি এবং কেন? নির্দ্বিধায় উত্তর আসবে টিভির পক্ষে এবং এর কারণ হল টিভি মানে ভিডিও। ঠিক তেমনি আপনার পন্যের ভিডিও করার চিন্তা করুন। কিছু না হোক স্মার্ট ফোন দিয়েই শুরু করুন। পারলে পন্য কিভাবে উৎপাদিত হচ্ছে বা পন্যের ভাল দিক নিয়ে দেখান। মিষ্টি বাড়ির ছেলেটি মনে হয় মিরাজ (https://www.facebook.com/meraz.official1 ) দেশের নানা প্রান্ত থেকে মিষ্টি সাপ্লাই দিচ্ছে। কক্সবাজার ই-শপের (http://coxsbazareshop.com/)লিটন দেবনাথ ভাই শুটকি মাছ, বার্মিজ ব্যাগ, আদিবাসিদের তৈরি চাদর এমন নানা পন্য বিক্রি করছেন। তারা দুজন যদি ভিডিও দেন তাহলে আমার মনে তাদের পন্যের পরিচিতি অনেক বেড়ে যাবে। আর ভিডিও হোস্ট করার জন্য ইউটিউব ফেইসবুক আছে।

৬। মিডিয়ার আশীর্বাদ অনেক কিছু বদলে দিতে পারেঃ ই-ক্যাব নিয়ে ৮ নভেম্বর প্রেস কনফারেন্স করি আমরা এবং ৮-১০ নভেম্বর পত্রিকা, টিভি চ্যানেল ও অনলাইন নিউজ মিলে ৬০+ মিডিয়াতে আমাদের কথা এসেছিল। সামহোয়্যার ইন ব্লগেও স্টিকি পোস্ট হয়েছিল আমার একটি লেখা। ফলে খুবই অল্প সময়ের মধ্যে ই-ক্যাব নিয়ে ব্যপক সাড়া পড়ে যায়। একথা ঠিক যে আপনার কোম্পানিকে মিডিয়া সেভাবে প্রচার করতে চাইবে না। কিন্তু একটু চেষ্টা করলে কিছু প্রচার হবেই।

৭। বিজ্ঞাপন এবং প্রচারেই প্রসারঃ প্রচারেই প্রসার কথাটি ১০০% সত্য। তবে আপনাকে বুঝতে হবে আপনার টার্গেট কাস্টমার কারা এবং কিভাবে বিজ্ঞাপন দিলে তাদের কাছে আপনার পন্যের প্রচার হবে। বিজ্ঞাপন মানে শুধু পত্রিকা ও টিভিতেই নয় বরং অনেকভাবেই হতে পারে। কোন সেমিনারে স্পন্সরশীপ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইভেন্টে অংশ গ্রহন এগুলোও ভাল বিজ্ঞাপন হতে পারে।

৮। ইন্টারনেট স্বর্ণের খনিঃ ইন্টারনেটে বিনামুল্যে প্রেস রিলিজ দেয়া যায় এমন বেশ কিছু সাইট আছে, ফেইসবুকের কমেন্টে আপনার সাইটের লিংক রাখতে পারেন, ব্লগের কমেন্টেও তা করা যায়। আরও বেশ কিছু উপায় রয়েছে যার মাধ্যমে ভিজিটর আনা যাবে। রয়েছে বেশ কিছু সোশ্যাল বুকমার্কিং সাইট। তবে স্পামিং আর রিলিভেন্ট কন্টেন্ট এর পার্থক্যটা আপনাকে আগে বুঝতে হবে। তা করতে না পারলে অনেক জায়গা থেকেই ব্যান্ড বা নিষিদ্ধ হয়ে যাবেন।

৯। সাহায্য করুনঃ আপনি যে সব পন্য বিক্রি করবেন সেগুলোর উপর হয় পণ্ডিত হন না হয় একজন লোক রাখুন। দোকানে গিয়ে আমরা যাই কিনিনা কেন দোকানদার বা সেলসম্যানদের অনেক প্রশ্ন করি। ঠিক সেভাবে আপনার ব্লগে বা ফেইসবুক পেইজে পন্য সংক্রান্ত যে কোন প্রশ্নের উত্তর দেবার চেষ্টা করুন। দরকার হলে স্কাইপে বা মোবাইলে উত্তর দিয়ে সাহায্য করুন। আপনার পন্য কিনল কি কিনল না মাথা ঘামাবেন না। দেখবেন প্রতি ১০০ জনে অন্তত ২০ জন আপনার পন্য কিনবে, রেগুলার কাস্টমার হবে এবং অন্যদের জানাবে।

১০। শুরুটা পরিচিতদের দিয়েই হোকঃ আপনার আত্মীয়, বন্ধু, কলিগ এদের দিয়েই শুরু করেন। তাদের জানান আপনার ওয়েবসাইটের কথা, পন্যের কথা। পারলে কিছু ডিস্কাউন্ট দিন তাদের। আপনার সাময়িক ক্ষতি হলেও বা লাভ না হলেও শুরুটা কিছুটা মসৃণ হবে।

১১। উৎসবের সময়ে বেশি চেষ্টা করুনঃ পহেলা বৈশাখ, পহেলা ফাল্গুন, ভ্যালেন্টাইন ডে, বন্ধু দিবস, রোজার মাস ও ঈদ, কোরবানির ঈদ, দুর্গা পূজা- এ ধরনের উৎসবের সময়ে মানুষ অনেক বেশি কেনাকাটা করে তাই না। তাহলে এসব উৎসবের ও বিশেষ দিনের অন্তত ১ মাস আগে থেকে প্রচারণা চালান।

শেষ কথাঃ শুরুতেই বলেছি যে প্রতিটি পয়েন্ট নিয়ে আলাদা করে পোস্ট দেব। ই-ক্যাব নিয়ে আমি খুবই ব্যস্ত কিন্তু তারপরও যদি আপনাদের ভাল লাগে তাহলে আমি নিয়মিতই লিখবো এই ব্লগে। আর এই পোস্ট উৎসর্গ করছি হাসান খান ভাই, জাহাঙ্গীর আলম শোভন ভাই, ভলান্টিয়ার নাজমুল ভাই এবং আফসানা আপুকে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s