বিমানপাড়া

গাড়ি নয়, ঘোড়া নয়- এখানে ছড়াছড়ি বিমানের। হাজার পাঁচেক অধিবাসী, বিমান তাদের অন্তত ৭০০। তারা কথাও বলে পাইলটদের ভাষায়। এলাকাটি পাইলটদের। তারাই সব। প্রতিটি বাড়ির সামনে দিয়ে চলে গেছে রানওয়ে। সেই এলাকার গল্প শোনাচ্ছেন ওমর শাহেদ
শেয়ার – মন্তব্য (0) – প্রিন্ট
গাড়ির বদলে প্লেনকে সাধারণ যানবাহন হিসেবে ব্যবহার করে ফ্লোরিডার স্প্রুট ক্রিক এলাকার মানুষ। নাশতা খেতে রেস্টুরেন্টে চলে যায় প্লেন চালিয়ে!
অ-অ+

শনিবার ঘুম থেকে ওঠেন ফোনের ডাকে- ‘আরে, এত বেলা করে ঘুমাচ্ছিস? নাশতা করতে যাবি না?’ তাড়াতাড়ি দাঁত ব্রাশ করে বেরিয়ে আসেন। ততক্ষণে হাজির অন্যরাও। দু-তিনজনের দলটা গল্প করতে করতে রানওয়ের দিকে এগিয়ে চলেছে। কলকল করতে করতে চলেছে সবাই। কারো কথায় কারো কান নেই। সপ্তাহজুড়ে কী কী হয়েছে, সে কথা বলতে ব্যাকুল। ককপিটে বসে পড়েছে একজন। সারা সপ্তাহ হয়তো বিমানটি চালিয়েছে বন্ধু। বন্ধু পেছনের সিটে। গল্প চলছে। চালিয়ে দিল। আশপাশের কোনো এক বিমানবন্দরে নামবে। তারপর সবাই মিলে নাশতা সারবে। শনিবারের এই আড্ডার একটি নামও দিয়েছেন তারা- ‘শনিবার সকালের হাঁসের ঝাঁক’।

সবাই বৈমানিক। থাকেও একই এলাকায়। বিমানচালকদের বিশ্বের সবচেয়ে বড় আবাসিক এলাকা সেটি। নাম ‘স্প্রুট ক্রিক’।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার এই এলাকায় গাড়ি চলাচলের রাস্তার কোনো বালাই নেই। সব বাড়ির সামনে দিয়ে চলে গেছে রানওয়ে। আর সেই ছোট্ট ছোট্ট রানওয়ে মিশেছে প্রধান রানওয়েতে। চার হাজার ফুট লম্বা ও ১৫০ ফুট প্রশস্ত।

বিমানপাড়াএটাই মূল রানওয়ে। অন্তত ৭০০টি প্লেন চলে এই এলাকায়

পাইলটদের এমন আবাসিক এলাকা আরো আছে পৃথিবীতে। যেসব দেশে বিমানের চলাচল বেশি, সেগুলোর মধ্যে কানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকা ও কোস্টারিকায় ছড়িয়ে গেছে এই বিমাননির্ভর জীবনযাত্রা। যুক্তরাষ্ট্রে আছে এমন ৬০০ আবাসিক এলাকা। তবে সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে আধুনিক বলতে গেলে স্প্রুট ক্রিকের নামটি নিতে হয়।

কিভাবে তারা সংঘবদ্ধ হলো? কিভাবে একটি জায়গায় বসবাস শুরু হলো পাইলটদের- সে প্রশ্নের জবাবে আমাদের ফিরে যেতে হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। ১৯৩৯ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার বছর যুক্তরাষ্ট্রে বিমান চালাতে পারে বিমানবাহিনীর এমন প্রশিক্ষিত সদস্যের সংখ্যা ছিল মোটে ৩৪ হাজার। যুদ্ধের কয়েক বছর পর ১৯৪৬ সালে তাদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় চার লাখে।

যুদ্ধ শেষ, বিমানবাহিনী থেকে অনেকে ফিরে এলো। এই বিপুলসংখ্যক মানুষ নিয়ে কী করা যায়? যারা এ কাজটি দেখাশোনা করে, সেই সিভিল এরোনটিকস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এক অবিশ্বাস্য ও খরুচে উদ্যোগ নিল। সারা দেশে ছয় হাজার আবাসিক বিমান চালানোর রানওয়েসহ এলাকা গড়ে তোলার প্রস্তাব করা হলো। এই উদ্যোগের ফলে পাইলটদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বেড়ে গেল, তারাও সংঘবদ্ধ হলো। সেই প্রস্তাবটি কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি। তবে স্বপ্নটি ছড়িয়ে গেল পাইলটদের মধ্যে। তারই ফল এই আবাসিক এলাকা।

স্প্রুট ক্রিকে আছে ১৮ হোলের গলফ কোর্স, তিনটির বেশি ফ্লাইং ক্লাব, ভাড়ায় বিমান নেওয়ার সুবিধা, বিমান চালানোর প্রশিক্ষণকেন্দ্র। বাড়ি বাড়ি বিমান থাকায় আছে তীক্ষ্ন নজরদারি। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা গাড়ি নিয়ে সারা এলাকা ঘুরে বেড়ায় টহলকর্মীদের দল।

অধিবাসীদের জীবনটাও ব্যয়বহুল- দামি গাড়ির ছড়াছড়ি। ল্যাম্বরগিনিস, কোরভেটিস দেখবেন। আরো দেখবেন অতি মূল্যের পোরশে জি২। হালফ্যাশনের মোটরবাইকগুলোও খুব চড়া দামে কেনা। অথচ বাস মাত্র হাজার পাঁচেক অধিবাসীর। মাত্র এক হাজার ৩০০ বাড়ি। তবে বিমান রাখার ছাউনি আছে ৭০০।

বেশির ভাগই পেশায় পাইলট। বাসিন্দাদের কথাবার্তা হয় বৈমানিকদের পরিভাষায়। অন্যদের মধ্যে আছে ডাক্তার, আইনজীবী ও ল্যান্ড ডেভেলপার।

আছে নানা ধরনের বিমান। দর্শনার্থীদের চোখ কপালে উঠে যায়, যখন দেখে রাশিয়ান মিগ-১৫ ফাইটার জেট। আরো দেখে মুগ্ধ হয়ে তারা পি৫১ মাস্টটাং, কয়েকটি এল-৯ অ্যালবাট্রস, একিলিপস-৫০০, ফরাসি ফুগা ম্যাগিস্টার।

এবার একটি মজার তথ্য দিই। এই এয়ারপার্কেই অনেক বছর থাকতেন জন ট্রাভোল্টা। বিখ্যাত হলিউড স্টার। প্রচণ্ড বিমানপ্রীতি তাঁর। ছেলেটার জন্মের পর ডাকতে চেয়েছিলেন ‘জেট’ নামে। মেয়েটার নাম দেওয়ার ইচ্ছা ছিল ‘কুয়ান্টাস’। তবে তাঁদের মায়ের ভয়ে আর পারেননি।

তিনি একটি বোয়িং-৭০৭ বিমানের মালিক। নিজেও পাইলট। অনেক অধিবাসী অভিযোগ করেছিলেন, তাঁর বিমানটি প্রচণ্ড শব্দদূষণ করে এবং তাঁর এই আড়াই লাখ পাউন্ড ওজনের বিমানটি রানওয়ের জন্য খুব বড়। সাবেক এই কুয়ান্টাস এয়ারলাইন জেট বিমানটির মালিক ছিলেন আরেক বিখ্যাত মানুষ ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা। সে অভিযোগের ফলে পার্কে বিমান চালানোর অনুমতি হারিয়ে ফেলেন ট্রাভোল্টা। এর আগেও তাঁরা বাগড়া দিয়েছিলেন। অভিযোগ করেছিলেন তাঁর আগের কেনা ৩৫ হাজার পাউন্ডের গলফস্ট্রিম ২ জেটের ব্যাপারেও। আর সহ্য হয়নি। যেখানে প্লেন চালাতে পারবেন না, সেখানে না থাকার সিদ্ধান্ত নেন অভিনেতা।

– See more at: http://www.kalerkantho.com/feature/obak-prithibi/2014/12/26/167608#sthash.7gpc2jFl.dpuf

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s