যেভাবে গ্রিসকে ফাঁদে ফেলা হলো…

গ্রিসের অর্থনৈতিক সঙ্কট নিয়ে বিশ্বের প্রতিটি মূলধারার গণমাধ্যমে বলা হয়েছে: ‘উদার ব্যাংকগুলো তাদের অর্থ দিয়েছিল কিন্তু সরকার অনেক বেশি অর্থ খরচ করে ফেলেছে এবং অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। গ্রিস এখনও সেই অর্থ ফেরত দিতে পারছে না কারণ তাদের যে অর্থ দেয়া হয়েছিল তারা সেটা অব্যবস্থাপনাগত কারণে শেষ করে ফেলেছে।’ কথাগুলো অনেকটাই বিস্ময়কর রকমের বিশ্বাসযোগ্য বটে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো এই গতানুগতিক বর্ণনা বড় ধরনের মিথ্যে। আর এটা শুধু যে গ্রিসের বেলাতেই করা হচ্ছে তা নয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য দেশ যেমন স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি এবং আয়ারল্যান্ডের ক্ষেত্রেও বলা হচ্ছে এবং এই দেশগুলো কৃচ্ছতাসাধনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। কয়েক দশক ধরেই ব্যাংক এবং করপোরেশনগুলো লাতিন আমেরিকা, এশিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশগুলোকে প্রতারণামূলকভাবে এই একই মিথ্যে কথা বলে আসছে। গ্রিস তার নিজের কারণে হারেনি, বরং গ্রিসকে জোর করে হারানো হয়েছে।

সত্যটি হলো, ব্যাংকগুলো গ্রিক সরকারকে নিঃশেষ করে দিয়েছিল এবং ক্রমাগত অস্থিতিশীল ঋণের ব্যাপারে চাপ প্রয়োগ করে আসছিল। এরকম পরিস্থিতিতে সরকারি আয় বাড়ানোর জন্য রাষ্ট্রায়ত্ব সম্পদগুলো ধীরে ধীরে তেলখনি মালিক এবং আন্তর্জাতিক কর্পোরেশনগুলোর কাছে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয় গ্রিস। কেন এবং কিভাবে তা করা হয়েছে নিবন্ধের বাকি অংশে তা বর্ণনা করা হবে।

আপনি যদি মাফিয়া চলচ্চিত্রগুলো সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে থাকেন, তাহলে তো জানেনই যে কিভাবে মাফিয়ারা জনপ্রিয় হোটেলগুলো কিনে নেয়। প্রথমে তারা হোটেলে কোনো হত্যাকাণ্ড কিংবা আগুন লাগানোর মাধ্যমে ব্যবসা নষ্ট করে। এরপর যখন ব্যবসায়ী  ক্রমশ সঙ্কটে ভুগতে থাকেন তখনই হাজির হন গডফাদার এবং খুবই উদারভাবে বন্ধুত্বের স্মারক হিসেবে সেই হোটেল-মালিককে কিছু অর্থ দিয়ে যান। এর বিপরীতে সেই হোটেলে গডফাদার-পক্ষের কিছু মানুষ ক্যাশের দায়িত্ব নেন এবং একটা সময় হোটেল-মালিকের বিরুদ্ধেই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনেন। আর এভাবেই হোটেল-মালিকের পতন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।…


গ্রিসের অর্থনৈতিক সঙ্কটের প্রথম কারণ হলো ‘গ্রেট ফাইনান্সিয়াল ক্রাইসিস’। আর এই ক্রাইসিসটি ছিল ২০০৮ সালে ওয়ালস্ট্রিট এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর মস্তিস্কপ্রসূত। ব্যাংকগুলো তৎকালীন সময়ে মর্টগেজ বা বন্ধক দেয়ার একটি মজার পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিল। তারা তাদের সকল কূটকৌশলগত অর্থনৈতিক বোমাগুলো ‘মর্টগেজ-ব্যাকড সিকিউরিটিজ’ (সিকিউরিটিজ: রাষ্ট্র এবং মুদ্রা তহবিলগুলোর মধ্যকার অস্থাবর সম্পদ গচ্ছিত বা বিনিময়সূচক পরিভাষা) তত্ত্বের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়েছিল। কারণ তাদের উদ্দেশ্য ছিল মূলত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাত থেকে মুনাফা উঠিয়ে নেয়া। ব্যাংকিং কাঠামোর এই অপরাধচক্রের অন্যতম অংশীদার হলো এই রেটিং এজেন্সিগুলো (প্রতিষ্ঠানসমূহের মান ও উৎপাদন যাচাইকারী সংস্থা) যেমন- এসঅ্যান্ডপি, ফিৎচ এবং মুডি’স। এই প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থনৈতিক পণ্যগুলোর উন্নয়ন-অবনমন নিয়ে তারকাখচিত রেটিং দেয়। যেমন ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার গোল্ডম্যান শ্যাক’র মতো প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের পেনসন ফান্ড এবং মিউনিসিপ্যালিটির কাছে ওই ভয়ঙ্কর সিকিউরিটিজগুলো বিক্রি করতে থাকেন। এই করে ব্যাংক এবং ওয়ালস্ট্রিটের গুরুরা কয়েক শত বিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু এটা হলো ব্যাংক এবং ওয়ালস্ট্রিট গুরুদের দেয়া প্রাথমিক চাল। আরও তিনটি  ধাপে তারা নিঃস্ব করার কাজটি করেছে।


অর্থনৈতিক প্যাকেজের সময়সীমাগুলো যখন শেষ হয়ে যায় তখন শুরু হয় আসল ধামাকা। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বাণিজ্যিক এবং বিনিয়োগকারী ব্যাংকগুলো বন্ধ হয়ে যেতে শুরু করে। স্থানীয় এবং আঞ্চলিক সরকারগুলোর চোখের সামনে তাদের সম্পদ স্রেফ উদ্বায়ী হতে শুরু করে। চারিদিকে ঝামেলা শুরু!

গোল্ডম্যান শ্যাক এবং অন্যান্য বড় ব্যাংকগুলোর মতো শকুনেরা মূলত তিনটি উপায়ে মুনাফা করে। প্রথমত, তারা ডলার এবং পেনির জন্য লেহম্যান ব্রাদার্স এবং ওয়াশিংটন মিচুয়াল ব্যাংকের মতো ছোটো ব্যাংকগুলো কিনে নেয়। দ্বিতীয়ত, সবচেয়ে ঘৃণ্য হলো গোল্ডম্যান্ড শ্যাক এবং জন পলসনের মতো (তিনি সম্প্রতি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়কে ৪০০ মিলিয়ন ডলার ডোনেশন দিয়েছেন) ব্যক্তিরা সিকিউরিটিজগুলোর মূল্য কমে যাচ্ছে বলে আলোচনা শুরু করে দেয়। যে কারণে অনেকেই তখন সিকিউরিটিজ খুবই কম মূল্যে বিক্রি করে দেয়। পলসন এই সিকিউরিটিজ থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলার উপার্জন করেছে, যা মিডিয়াতে ফলাও করে বলাও হয়েছিল। তৃতীয়ত, ক্ষতস্থানে লবণ দেয়ার মতো করে বড় ব্যাংকগুলো তখন নাগরিকদের উপর বেইলআউট উঠিয়ে নেয়ার পাঁয়তারা করে। কিন্তু যে স্থানীয় ব্যাংকগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছে, তাদের হাতেই কিন্তু ইতোমধ্যে ওই নাগরিকেরা নিঃস্ব হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে তারা আয়করদাতাদের কাছ থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলার এবং ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে ট্রিলিয়ন ডলার স্রেফ নিয়ে যায়।

‘গ্রিসের স্থানীয় ব্যাংকগুলো দেশিয় নাগরিকদের কাছ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বেউলআউট পেয়েছিল।’


ব্যাংকগুলো এক পর্যায়ে সরকারগুলোকে জোরপূর্বক ঋণদান করে। এই ঋণই মূলত ভাইরাস অথবা ব্যাকটেরিয়ার মতো ধীরে ধীরে গোটা ব্যাবস্থাটিকে ধ্বংস করে ফেলে। প্যারাসাইটিক ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংকগুলোর (শুধুমাত্র এক দেশ থেকে অপর দেশে সম্পদেআদান-প্রদান করে; পরজীবী ব্যাংক হিসেবে পরিচিত) একটি প্রমাণিত কৌশল হলো দেশগুলোর বণ্ডের রেট কমিয়ে দেয়া। ২০০৯ সালের শেষের দিকে ব্যাংকগুলো ঠিক তাই করেছিল। রাতারাতি বণ্ডগুলোর সুদের হার বেড়ে গেল। যে কারণে অনেক দেশের পক্ষেই এতো ব্যয়বহুল বণ্ড রাখা সম্ভব হয়নি, অনেক দেশ বিক্রি করে দিয়েছে অথবা আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো থেকে ধার করে বণ্ড কিনেছে। ২০০৯ সাল থেকে ২০১০ সালের মধ্য পর্যন্ত গত দশ বছরের বণ্ডগুলোর মূল্য প্রায় তিনগুণ বেড়ে যায়। আর এই নিষ্ঠুর অর্থনৈতিক আঘাত গ্রিক সরকারকে একেবারেই পর্যদুস্ত করে দেয়। অন্যদিকে ব্যাংকগুলো ১১০ বিলিয়ন ইউরো ঋণ দিয়ে তাদের প্রথম ঋণ থেকে মুক্তি পায়।

এই ব্যাংকগুলো জাতির রাজনীতিও নিয়ন্ত্রণ করে। ২০১১ সালে গ্রিক প্রধানমন্ত্রী যখন দ্বিতীয় বৃহৎ বেইলআউট প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন তখন ব্যাংকগুলো একপ্রকার জোর করেই তাকে সরিয়ে দেয় এবং ইউরোপীয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্টকে তার স্থানে স্থলাভিষিক্ত করা হয়। কোনো নির্বাচন দরকার হয়নি। একেই হয়তো উৎকৃষ্ট গণতন্ত্র বলা হয়। আর সেই নতুন পুতুল ক্ষমতায় বসেই ব্যাংকগুলোর দেয়া সবগুলো কাগজে সাক্ষর করে দেয়। যদিও এই পুতুল শাসক ২০১১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এর কয়েক মাস পর ২০১২ সালে, সেই বণ্ড নিয়েই আবার ব্যাংকস্টাররা নতুন রাজনীতি শুরু করে। নিয়মবর্হিভূতভাবে বণ্ডের দাম ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়ার কারণে যা হবার তাই হলো। গ্রিক সংসদ দ্বিতীয় বৃহত বেইলআউট নিতে বাধ্য হলো, যা প্রথম বেইলআউটের চেয়েও অধিক ছিল।

এখন যে বিষয়টা হচ্ছে, যা অনেক মানুষই বুঝতে পারছে না; এই ঋণগুলো সাধারণ ঋণের মতো নয়, যেমনটা আমরা সচরাচর ব্যাংক অথবা ক্রেডিট কার্ড দিয়ে নিয়ে থাকি। এই ঋণগুলো মূলত একটি দেশের মোট সম্পদ এবং বেসরকারিকরণের সঙ্গে অনেকবেশি সম্পর্কযুক্ত। গোল্ডম্যান শ্যাকস অথবা আইএমএফের বিভিন্ন চাহিদা এবং শর্তের ভিত্তিতেই এই ঋণগুলো দেয়া হয়।


শেষমেষ যে ঋণগুলো নেয়ার কারণে গ্রিসকে বাধ্য হয়েই তার অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং মুনাফা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন তেলকোম্পানি এবং আন্তর্জাতিক করপোরেশনগুলোর কাছে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়। এই বেসরকারীকরণের ফলে যেখানে মুনাফা সেখানেই শুধু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ করে, যেহেতু তারা সরকারি প্রতিষ্ঠান নয় তাই তারা বাধ্যও নয়। গ্রিসে পানি, বিদ্যুৎ, ডাকঘর, বিমানবন্দর, জাতীয় ব্যাংক, টেলিযোগাযোগ, বন্দর কর্তৃপক্ষসহ প্রায় সবগুলো খাতই বর্তমানে বেসরকারি। উপরন্তু এই ব্যাংকগুলো গ্রিসের বাজেটের প্রতিটি অর্থের উপর নজর রেখেছে। সেনাবাহিনীর ব্যয় কমাবেন? না। তেলকোম্পানি এবং বড় করপোরেশনগুলোর উপর অধিক কর ধার্য করবেন? না। প্রায় প্রতিটি ক্ষেতেই এভাবে গ্রিসকে নিয়ন্ত্রণ করছে এই ব্যাংক এবং করপোরেশনগুলো।

ওই ব্যাংকারগুলোর হাতে বেসরকারী খাত চলে যাওয়ার কারণে নিশ্চিতভাবে সরকারের আয় কমতে থাকে এবং ক্রমশ ঋণ বাড়তে থাকে। এই সমস্যা থেকে কিভাবে মুক্তি মিলবে? ব্যয় সংকোচনের ফলে! শ্রমিকদের কাজ থেকে বিতাড়িত করে! মজুরি কমিয়ে! পেনসন কমিয়ে! জনসেবা খাত থেকে বরাদ্দ কমিয়ে! কর বাড়িয়ে! এতকিছু করে যদি সমস্যা থেকে মুক্তি মিলতো তাহলে গ্রিসকে বেইলআউট প্রশ্নে গণভোট আয়োজন করতে হতো না। পেনসন থেকে এক শতাংশ অর্থ কর্তন করা হলে অন্যদিকে কর বেড়ে যাচ্ছে ২০ শতাংশ বেশি। তাই গ্রিস আজ এমন এক অর্থনৈতিক ধসের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে যা ১৯৩০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ধসের চেয়েও তীব্রতর।

ব্যাংকগুলোর দাবি অনুযায়ী দেশের সকল মিডিয়ার বেসরকারিকরণ হওয়ার কারণে  খুব সহজেই মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। তখন সেই মিডিয়া দিয়েই প্রতিনিয়ত ওই লোভী ব্যাংকস্টারদের জাতীয় ত্রাতা হিসেবে উপস্থাপিত করা হয়। যদি প্রত্যেক গ্রিক এই কৃচ্ছতাসাধন নীতি সম্পর্কে জানতেন তাহলে অন্তত এই ফাঁদে তারা আটকাতেন না। একই অবস্থা স্পেন, ইতালি, পর্তুগাল, আয়ারল্যান্ড এবং অন্যান্য দেশগুলোতেও, যেখানে এই একই কৃচ্ছতাসাধণ নীতি প্রয়োগ করা হচ্ছে। কষ্টকর বিষয় হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে অগুনিতবার আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক লাতিন আমেরিকা, এশিয়া এবং আফ্রিকার অনেক দেশের উপর এই আগ্রাসী নীতি খাটিয়েছে। এটা হলো বিশ্ব শাসন করার নব্য পন্থা। বিশ্ব এখন কিছুসংখ্যক কর্পোরেশন এবং ব্যাংকের মালিকানায় পরিণত হয়েছে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s