আমার দিন: বাংলাদেশে সিলিকন ভ্যালি তৈরীর চ্যালেঞ্জ

২০০০ সালের মে মাস। টেক্সাস এ.এন্ড.এম বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্সে আমার মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হয়েছে মাত্র। ক্যাম্পাসে জব ফেয়ার। ক্যাম্পাস থেকে রিক্রুট করার জন্য অনেক প্রতিষ্ঠান এসেছে। তার ভেতর নেটওয়ার্কিং প্রতিষ্ঠান সিসকোও রয়েছে।

সিসকোকে আমি ঢাকা থেকেই চিনতাম। প্রশিকা (বিডি-অনলাইন) থেকে যখন ইন্টারনেট সেবা দিতাম, তখন সিসকোর বাক্স নিয়ে কাজ করতে হয়েছিল। সেই তখন থেকেই এই প্রতিষ্ঠানটির প্রতি দুর্বলতা ছিল। ঢাকা শহরে তখন রাউটার কি জিনিস খুব একটা কেউ জানত না। যদিও সময়টা বেশি দিন নয়, তবুও মাঝে মাঝে ‘প্রাচীনকাল’ মনে হয়!

এর ভেতর আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল। বুয়েটে আমার সহপাঠী ইব্রাহিম ফয়সাল (তুহিন) তখন কাজ করত সিলিকন ভ্যালিতে, আর আমি টেক্সাসে। তুহিন দাওয়াত দিয়েছিল ভ্যালিটা ঘুরে যাওয়ার। সেই প্রথম সিলিকন ভ্যালিতে পা দেয়া। এখনও মনে আছে, ওখানকার রাস্তার পাশে মাটিতে আমি সত্যি সত্যি শুয়ে পড়েছিলাম- মাটির গন্ধ নেয়ার জন্য, মাটির ভালবাসা নেয়ার জন্য। তুহিন নিয়ে গিয়েছিল সিসকোর বিশাল ক্যাম্পাসে। সেই তখনই ঠিক করে রাখি, এই প্রতিষ্ঠানেই কাজ করব এবং সেটা সিলিকন ভ্যালিতেই। আমার জীবনকে যে কিছু মানুষ তাদের অজান্তেই কেরামের ঘুঁটির মতো টুক করে ধাক্কা দিয়ে মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে, তাদের মধ্যে অন্যতম হলো ইব্রাহিম ফয়সাল। ওই একটা ঘটনা আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

যেই সিসকোকে নিয়ে আমি স্বপ্ন দেখতাম, সেই প্রতিষ্ঠানটি যখন নিজের ক্যাম্পাসেই এসে হাজির, তখন বুকের ভেতর ঢিব ঢিব করবে এটাই স্বাভাবিক। বিদেশের মাটিতে প্রথম চাকরির ইন্টারভিউ। তখনও গায়ে মিরপুরের গন্ধ লেগে আছে। সেই ভয় নিয়েই বোকা বোকা চেহারায় ইন্টারভিউয়ের মুখোমুখি হলাম।

সিসকো ছিল ২০০০ সালের সবচেয়ে হট কোম্পানি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগের বছর ৩-৪ জন সিসকোতে জয়েন করেছিল। তাদের একজন এবং আরও কিছু কর্মীসহ তারা ক্যাম্পাসে এসেছে। আমাদের যখন প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ব্রিফিং করা হলো তখন জানতে পারলাম, সিসকোতে যারা চাকরি করেন, তাদের বেতন কত হবে সেটা নিয়ে মোটেও কথা বলেন না। তারা কত স্টক-অপশন পাবেন, সেটাই মূল বিষয়। হিউম্যান রিসোর্সের মেয়েগুলো এমনভাবে আমাদের লোভ দেখাচ্ছিল যে, বিনা বেতনেই যেন আমরা চাকরির অফার নিয়ে নেই। কারন কিছুদিন পরেই আমরা সবাই মিলিয়নিয়ার হয়ে যাচ্ছি। আর আমি হলাম এমন মানুষ যে কি না জীবনে এই প্রথম স্টক অপশনের কথা শুনলাম!

ইন্টারভিউয়ের অনেক ধাপ পার হয়ে কিভাবে যেন একটি টিম আমাকেও নির্বাচন করে ফেলল। আমরা ৪ জন (যতটা মনে পড়ে) নির্বাচিত হয়ে গেলাম। পরের সপ্তাহেই অফার এলো। হিউম্যান রিসোর্সের মেয়েটি ফোন করে বলল, তুমি বেতন নিয়ে বার্গেইন কর না। অফারটা নিয়ে নাও। যে টিমে কাজ করবে, সেটা খুবই প্রভাবশালী টিম। তোমার ম্যানেজার খুব ভাল। ‘অফার লেটার’ সাইন করে পাঠিয়ে দাও।

আমি তো বিয়ের পিঁড়িতে বসেই ছিলাম। কবুল বলাটাই শুধু বাকি ছিল। সাইন করে পাঠিয়ে দিলাম অফার লেটার। আর কোথাও ইন্টারভিউ দেয়ার প্রয়োজন মনে করলাম না, যদিও বন্ধুরা বলল আরও কত কোম্পানি আছে সেগুলো দেখতে ক্ষতি কী! ভাল অফার তো থাকতে পারে! আমি ভাল অফারের জন্য মরিয়া ছিলাম না; আমার মাথায় ছিল সিসকোতে ঢোকা। সেটা যখন হয়ে গেছে, চারপাশে তাকিয়ে আর লাভ কী! জুন মাসেই চলে যাই সিলিকন ভ্যালি- আমার স্বপ্নের শহরে। আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের সময় ছিল সিসকোতে কাজ করা।

 

দুই.

বাংলাদেশে এখন সিলিকন ভ্যালি তৈরির একটা কথা খুব শোনা যায়। বিভিন্ন মিটিংয়ে, বক্তৃতায়, আলোচনায় এবং সরকারও চায়, বাংলাদেশে এমন একটি ব্যাপার ঘটুক। এর জন্য ডিজিটাল বাংলাদেশের ব্যানারে অনেক ধরনের কর্মকান্ড করা হচ্ছে। প্রচার প্রচারণার শেষ নেই। কিন্তু আমি জানি না, তারা আসলেই সিলিকন ভ্যালি তৈরির চ্যালেঞ্জটুকু বুঝতে পারেন কিনা। জনপ্রিয়তার জন্য অনেক কিছুই বলা যেতে পারে, করা যেতে পারে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে সিলিকন ভ্যালি তৈরি করতে হলে, তার চ্যালেঞ্জগুলো বুঝতে হবে। তারপর সেটাকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নিয়ে সঠিকভাবে এক্সিকিউট করতে পারলে তখন কিছু ফলাফল দেখা যেতে পারে।

আবার সিলিকন ভ্যালির কথা এলেই অনেকে ভারতের ব্যাঙ্গালোরের উদাহরণই টেনে নিয়ে আসেন। অনেকেই মনে করেন, ব্যাঙ্গালোর সিলিকন ভ্যালি হয়ে গেছে। কথাটি কিন্তু সত্যি নয়। একটি দেশে কিংবা শহরে তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে অনেক মানুষ কাজ করে – তার অর্থই সেটা সিলিকন ভ্যালি, এমনটা ভাবা খুব বোকামি, কিংবা অজ্ঞতা। এটা ঠিক যে, ভারতের ব্যাঙ্গালোরে অসংখ্য মানুষ তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কাজ করে, বিশ্বের অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান এখানে তাদের অফিস করেছে- লাখ লাখ মানুষ এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। কিন্তু সেটা সিলিকন ভ্যালি হয়ে যায়নি। বাংলাদেশে আমরাও যদি একই রকম বিকাশ আনতে চাই, তাহলে আমাদের বলা উচিত বাংলাদেশে ব্যাঙ্গালোরের মতো একটি শহর হবে, যেখানে লাখ লাখ তরুণ তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করবে। তাই আমরা কী হতে চাই, সেটা নির্ধারণ করাটাও জরুরী।

আমার এই লেখায় সিলিকন ভ্যালির চ্যালেঞ্জটা লিখে দিচ্ছি। তারপর অন্যদিন ব্যাঙ্গালোর নিয়ে লেখা যাবে। তবে এখানে মোটা দাগে একটি বিষয় বলে রাখি – আমরা যারা ইংরেজী জানি, তারা নিশ্চই ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ এবং ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’- এই দুটো লাইনের অর্থ বুঝি। বর্তমান ভারত “মেড ইন ইন্ডিয়া” থেকে “মেক ইন ইন্ডিয়া”-য় সরে এসেছে। তবে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তিকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে একটি মানুষের নাম সবসময় সামনে চলে আসে- তিনি হলেন চন্দ্র বাবু নাইডু। তাকে সহায়তা দিয়েছিল সরকার, বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভারতবাসী। আমরা পুরো শিল্পটিকে কোথায় নিয়ে যেতে চাই সেটা জানা যেমন জরুরী- একইভাবে আমাদের চন্দ্র বাবু নাইডুর মতো তেমন কেউ আছেন কিনা, সেটাও জানা জরুরী।

 

তিন.

আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের দক্ষিণে হলিউড আর উত্তরে সিলিকন ভ্যালি। স্যান হোজে, পালো আল্টো, সানি ভ্যাল, কুপারটিনো, মাউন্টেন ভিউ, স্যান্টা ক্লারা, ফ্রিমন্ট, মিল পিটাস, মেনলো পার্ক, রেডউড সিটি ইত্যাদি শহর মিলে তৈরি হয়েছে পুরো এলাকা। এর বাইরেও আশপাশে আরও কিছু শহর রয়েছে। পাহাড়ের উপর আসলেই একটি ভ্যালি এটি। এর একপাশে প্রশান্ত মহাসাগর, আর তিন দিকে পাহাড় থাকায় এর জলবায়ু বিশ্বের একটি ইউনিক স্থানে পরিণত করেছে। একবার যে সিলিকন ভ্যালিতে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে যাবে, তার পক্ষে বিশ্বের অন্য কোথাও থাকাটা যে কতটা কষ্টকর সেটা লিখে বুঝানো যাবে না। বছরের ১০ মাসই পুরো এলাকাটা একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ যেন।

তবে সিলিকন ভ্যালির মূল শক্তি হলো ব্রেন পাওয়ার। এই বিশ্বের আর কোন শহরে এত অল্প জায়গায় এত ব্রেন পাওয়ার নেই (তথ্যপ্রযুক্তি খাতে)। ভাল আবহাওয়া হয়ত তাদের এখানে নিয়ে এসেছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় অবদান রেখেছে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়- স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া। এরা প্রতিবছর পুরো বিশ্ব থেকে যে পরিমাণ ট্যালেন্টকে টানে, তার বিশাল অংশ আবার ওই শহরেই কাজে লেগে যায়- তা অনেক শহরের নেই। ঢাকাতে যদি সিলিকন ভ্যালির ছিটেফোঁটাও তৈরি করতে হয়, তাহলে প্রথমেই লাগবে প্রচন্ড ভাল একটা/দুটো বিশ্ববিদ্যালয়, যারা বাংলাদেশের সবচেয়ে ভাল ট্যালেন্টকে এনে তাকে পরবর্তী চ্যালেঞ্জের জন্য তৈরি করে দেবে।

বাংলাদেশের মানুষ মনে করেন, বুয়েট হলো তেমন একটি জায়গা। আমি তা মনে করি না। আন্তর্জাতিক মাপকাঠিতে বুয়েট মোটেও ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়। বুয়েটে ইন-টেক ভাল অর্থাৎ এখানে ভাল রেজাল্ট নিয়ে ছেলেমেয়েরা পড়তে আসে। কিন্তু বুয়েট তাদের পরবর্তী চ্যালেঞ্জের জন্য মোটেও তৈরি করে দেয় না। বুয়েটের একটা অংশ দেশের বাইরে চলে গিয়ে সেটার খুব ক্ষুদ্র একটা অংশ নিজের প্রচেষ্টায় খুব ভাল করে কর্মজীবনে। আর দেশের ভেতরও বুয়েটের এমন ক্যাপাসিটি তৈরি হয়নি, যা একটি শিল্পকে সামনে টেনে নিতে পারে। একটি বিষয়ে গভীরে যাওয়ার মতো যে পরিবেশ প্রয়োজন, তা বুয়েটে নেই। গবেষণা তো নেই বললেই চলে, এখন আরও কমেছে। বিশ্বের মাপকাঠিতে বুয়েটকে একটা ছোটখাটো কোচিং সেন্টার ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না আমার। এমনকি ভারতের একটি আইআইটি যা তৈরি করে, বুয়েট তার আশপাশে নেই। আমি জানি, কেউ কেউ একটা-দুটা উদাহরণ দেখানোর চেষ্টা করবেন। কিন্তু ওই ২-৩ জন সফল ইঞ্জিনিয়ার নিয়ে একটা শিল্প তৈরি হয় না। তবে আমি এটাও বিশ্বাস করি যে, বাংলাদেশে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি হলো বুয়েট। এই দেশে এত টেলেন্ট একসাথে জড়ো করার মতো ক্ষমতা আর কোন প্রতিষ্ঠানে এখনও গড়ে ওঠেনি। কিন্তু বর্তমানে বুয়েটের যে কালচার দেখতে পাই, তাতে আমি আর আশার আলো দেখতে পাই না।

সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন আসতে পারে, অন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয় কি এটা পারে? সবাই মিলে কি সেটা পারে? উত্তর হলো- না। সোজা কথা, ভাল মানের যেই ভলিউমের লোকবল দরকার, তার ছিটেফোঁটাও বাংলাদেশ তৈরি করতে পারে না। গায়ের জোরে আমরা অনেক কিছুই হয়ত পারি, কিন্তু ‘তথ্য উপাত্ত’ দিয়ে তাকে দাঁড় করানো যাবে না। আর যতক্ষণ না আপনি সঠিক ডাটার উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, ততক্ষণ সিলিকন ভ্যালি হওয়াটা দুঃস্বপ্ন ও রসিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

তাহলে উপায়? উপায় আছে। সরকারকে ২-৩টা বিশ্ববিদ্যালয়কে স্টানফোর্ডের আদলে, আইআইটির আদলে তৈরি করতে হবে, যেখানে মেধার চর্চা হবে, দলের নয়। সরকারকে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করার মতো সাহস থাকতে হবে এবং ওটার ভিসি হওয়ার জন্য, অধ্যাপক হওয়ার জন্য কোন দলের চামচাগিরি করতে হবে না- যোগ্যতার ভিত্তিতে তৈরি হবে তাদের ক্যারিয়ার।

আমি বাংলাদেশকে যতটা চিনি, কোন সরকার এটা করতে পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি না। তবে আমি চাই, আমার এই বিশ্বাসটুকু ভুল হোক।

 

চার.

সিলিকন ভ্যালি হওয়ার পেছনের দ্বিতীয় উপাদানটি হলো উদ্ভাবন করার ক্ষমতা। পৃথিবীর অনেক শহরই হয়ত ট্যালেন্ট যোগাড় করতে পারবে। কিন্তু তাদের ভেতর উদ্ভাবনী শক্তি থাকবে কিনা, সেটা নিশ্চিত নাও হতে পারে। যেমন ভারত, জাপান, ইউরোপ কিংবা ইংল্যান্ড। এদের অনেক ট্যালেন্ট রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে উদ্ভাবনীও রয়েছে কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এরা এখনও তেমন উদ্ভাবনী দেখাতে পারেনি। ফলে বিশ্বের যাবতীয় তথ্যপ্রযুক্তির নতুন সেবা এবং পণ্য আসছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। ফেসবুক, টুইটার, উবার, গুগল, লিংকড-ইন, ওরাকল, ইয়াহু, সিসকো, জুনিপার, ইন্টেল, এ্যাপল, টেসলা ইত্যাদি যত প্রতিষ্ঠান এই গ্রহের তথ্যপ্রযুক্তি বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করে, তার সবই আমেরিকার সিলিকন ভ্যালিতে। তবে পূর্ব ইউরোপের কিছু দেশ এবং ইসরায়েল উদ্ভাবনীতে অনেক ভাল করছে। তাই বাংলাদেশে হবে ভবিষ্যতের গুগল কিংবা ফেসবুক- এটা শুনতে যত সুন্দর শোনায়, মানুষকে সেটা বিশ্বাস করানো ততটাই কঠিন। স্বপ্ন দেখানোর জন্য আমরা অনেক কিছুই বলতে পারি। কিন্তু মানুষের স্বপ্নভঙ্গ হলে তখন যে হতাশা চেপে বসে, তার চেয়ে ক্ষতিকর আর কিছু নেই। স্বপ্নগুলো বাস্তবের কাছাকাছি হলে সবার জন্যই মঙ্গল।

এখন প্রশ্ন হতে পারে, বাঙালীর কি উদ্ভাবনী শক্তি নেই? আমি তো বিশ্বাস করি আছে। এই দেশে তো জগদীশ চন্দ্র বসুর জন্ম হয়েছিল, এই মাটিতে তো সত্যেন বোসের জন্ম হয়েছিল। তাহলে তাদের পর আর হচ্ছে না কেন? এর ধারাবাহিকতা নেই কেন? এমনকি ৭০ দশকে বাংলাদেশে যে মাপের মানুষ ছিলেন, এখন কি তাদের মতো বিচক্ষণ মানুষ আমরা দেখতে পাই?

উদ্ভাবনী শক্তি তৈরি জন্য একটা পরিবেশের প্রয়োজন হয়, যেখানে একজন মানুষ তার মতো করে ভাবতে পারে, তার জ্ঞানকে, ভাবনাকে, চিন্তাকে পরীক্ষা করতে পারে, এবং সেটাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার মতো সাহস দেখাতে পারে। বাংলাদেশ কি তার জন্মের পর কখনও সেই পরিবেশ পেয়েছে? যুদ্ধের পর দেশটি লন্ডভন্ড হয়েছিল। কিন্তু তারপর দীর্ঘ সময়ে আমরা কি একটা স্থির ব্যবস্থা আনতে পেরেছি, যেখানে মানুষ তার উদ্ভাবনী শক্তির প্রকাশ ঘটাবে? কিংবা তার বিকাশ হবে? আমাদের ভেতরের সেই চর্চাকে কি আমরা ধরে রাখতে পেরেছি? জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি চর্চা- এগুলো কি আমাদের জীবনের অংশ? (দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোর বিজ্ঞান পাতা দেখলেই তার চিত্র পাওয়া যাবে।)

বাংলাদেশ তার প্রকৃত উদ্ভাবনী শক্তির চর্চা থেকে সরে এসেছে। এখন আমরা উদ্ভাবনী দেখতে পাই চামচামিতে, ঘুষ নিতে, প্রশ্নপত্র ফাঁসে, শেয়ার বাজারে, ব্যাংক ডাকাতিতে, গুণীজনদের অপদস্থ করতে, একজন আরেকজনকে ঘায়েল করাসহ নানান কাজে। এমন একটা অসুস্থ পরিবেশে মানুষ প্রকৃতই উদ্ভাবনী শক্তিকে বিকাশ করবে, তা প্রায় অসম্ভব। তবে এক ধরনের ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’ চালু করে এটাকে হয়ত পুশ করা যেতে পারে। যেমন আইপিও ব্যবস্থা। অবশ্য সেখানেও বিশাল জালিয়াতির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। যে দেশের মানুষ যেকোন একটি পণ্য বানাতে গেলেই সেটার ভেতর ভেজাল দেয়াটাই নিয়ম মনে করে (বাংলাদেশের মানুষ খাবারে যে কি বিষ খায়, সেটা নিয়ে যদি লিখি তাহলে তারা আমাকে মেরেই ফেলবে!), সেখানে তথ্যপ্রযুক্তির পণ্য তৈরি হবে তা প্রায় অসম্ভব। কারণ, তথ্যপ্রযুক্তিতে ভেজালের সুযোগ নেই। আমি মনে করি, এটা একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।

 

পাঁচ.

সিলিকন ভ্যালি হয়ে ওঠার আরও একটি চ্যালেঞ্জ হলো বিনিয়োগ। সিলিকন ভ্যালি হলো এমন একটি জায়গা যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করার সময় ওই অল্প বয়সেও কারও উদ্ভাবনী উপযুক্ত মনে হলে, সেই ছেলে বা মেয়েটি যথার্থ বিনিয়োগ পেতে পারে। সেখানকার ফ্রেমওয়ার্ক এমন যে, বিনিয়োগ যেমন নিরাপদ এবং আইন সকলের স্বার্থ রক্ষা করে থাকে। পাশাপাশি একটি প্রতিষ্ঠানকে বড় করার জন্য বিনিয়োগের পর প্রতিষ্ঠানটিকে স্টক মার্কেটে নিয়ে (কিংবা অন্য কেউ কিনে নিতে পারে) যাওয়া সম্ভব।

বাংলাদেশ সরকার তথ্যপ্রযুক্তি এবং কৃষি খাতে বিনিয়োগের সুযোগের জন্য ইইএফ ফান্ড নামে একটি তহবিল তৈরি করেছিল। সেই তহবিলের টাকা আমাদের ক্রিয়েটিভ উদ্যোক্তারা এমনভাবে নয়-ছয় করেছেন যে, এখন আর কারও ভাগ্যে সেই বিনিয়োগ জোটে না। সরকারী এই বিনিয়োগের কথা একটি উদাহরণমাত্র।

সিলিকন ভ্যালিতে প্রতি ১০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গড়ে একটি প্রতিষ্ঠান সফল হয়, ৯টি মারা যায় অর্থাৎ সফল হওয়ার হার শতকরা ১০ ভাগ। তবে একটি সফল হলে বাকিগুলোর ক্ষতি পুষিয়ে যায়। আমরা এখনও এই কালচারটি প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। এই কালচারটি তৈরি করা সম্ভব যে নয়, তা নয়। প্রয়োজন সঠিক ফ্রেমওয়ার্ক। সেই ফ্রেমওয়ার্ক নিয়ে বাংলাদেশ অনেক দিন ধরে কাজ করছে। দেখা যাক, কবে নাগাদ সেই পরিবেশটি তৈরি হয়।

পরিশেষে আরেকটি কথা না বললেই নয়। সিলিকন ভ্যালির নিজস্ব একটা কালচার আছে, যা কেবলমাত্রই সিলিকন ভ্যালির। এমনকি আমেরিকার অন্যান্য শহরেও এটা নেই। এই কালচারটা ঠিক লিখে পুরোটা প্রকাশ করা যাবে না। এক কৃষক ধানক্ষেতের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে তার মনের ভেতর যে কেমিস্ট্রি তৈরি হয়, এক অভিনেতার মঞ্চ দেখলে যে আবেগ তৈরি হয়, একজন শিল্পীর ফ্রান্সের রাস্তায় যে অনুভূতি হয়- সেটা কি একজন সাধারণ মানুষের হৃদয়কে একইভাবে ছুঁয়ে যায়? তাই হয়ত সিলিকন ভ্যালিকে এখনও কেউ কপি করতে পারেনি। হয়ত পারবেও না কখন!

 

২৩ অক্টোবর ২০১৫
লেখক : তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং সম্পাদক, প্রিয়.কম
ই-মেইল: zs@priyo.com

লেখাটি একই সাথে দৈনিক জনকণ্ঠে ২৬ অক্টোবর ২০১৫ তারিখে প্রকাশিত

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s